পরিচিত এক ধর্মান্ধ ব্যক্তিকে ধর্মীয় ব্যাপারে তার কয়েকটি প্রশ্নের যথাযথ জবাব দেওয়ার পর সে সেগুলো মানতে বাধ্য হয়েছিল । কিন্তু দু'একদিন পর লক্ষ্য করলাম তার কোন পরিবর্তন হয় নাই এবং সে পূর্ববর্তী অবস্থায়ই ফিরে এসেছে ।
যে মস্তিষ্ককে ইমান বা বিশ্বাস দ্বারা ঢেকে ফেলা হয়েছে সেইরূপ দুর্বল মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতা কমে যায় বিধায় সেখানে নতুন কিছু সহজেই প্রবেশ করতে পারেনা এবং তবে কোন ক্রমে প্রবেশ করলেও তা ধারণ করতে পারে না বিদায় দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে না ।
আমার আব্বা একটি গল্প বলেছিলেন ।
পূর্বে বাংলাদেশ কলেরা,বসন্ত ও টাইফয়েডের ব্যাপক প্রকোপ ছিল । গ্রামে এই সমস্ত রোগের আক্রমণে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটত।এই সময়ে মসজিদের হুজুররা গ্রামবাসীদের বলতো, গ্রামে ওভা ঢুকেছে।
হুজুররা বলতো রোগবালাই আল্লাহর নাফরমানি থেকেই সৃষ্টি হয় । তাই একে দূর করতে হলে আল্লাহ নাম নিয়ে জিকির করতে হবে । তখন গ্রাম থেকে ওবা বিতারনের লক্ষ্যে রাত্রে গ্রামবাসীদের সাথে নিয়ে দলবদ্ধভাবে গ্রামের এক প্রান্ত থেকে উচ্চস্বরে জিকির করতে করতে অন্য প্রান্তে যাওয়া হত ।
কিন্তু সারা রাতের এত পরিশ্রমের পরেও সকালে খবর পাওয়া যেত ওমক বাড়ির এক ব্যক্তি বসন্ত রোগে মারা গিয়েছে । গ্রামবাসীরা যখন হুজুরের কাছে জানতে চাইত - এত পরিশ্রম করে ফায়দা কি হলো ? হুজুরের সাফ জবাব, আরে মিয়ারা মানুষ কি আর মানুষ আছে ? তাদের ঈমান আমান সব নষ্ট হয়ে গিয়েছে । তাইতো আল্লাহ তাদের ডাকে সারা দেয় না ।
অতীতে দীর্ঘ সময়ব্যাপী এই রেওয়াজ চালু ছিল । হুজুরদের কথায় জিকির করে কোন লাভ হয় নাই । এর ফলে কলেরা, বসন্ত ও টাইফয়েড না কমে বরঞ্চ তাহা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইত।
ঐ সময়ে মানুষ পুকুরের পানি পান করত । একই পুকুরে তারা গোসল করত, কাপড়-চোপড় ধৌত করত । কলেরা,বসন্ত ও টাইফয়েড রোগীর কাপড়ও একই পুকুরে ধৌত করা হতো । ফলে পুকুরের পানি এই সমস্ত রোগের জীবাণু দ্বারা সংক্রামিত হত । মহিলারা এই পানি মাটির কলসিতে ভরে বাড়িতে নিয়ে যেত এবং সকলে সেই পান করত । এইভাবে রোগের আরও বিস্তার ঘটল এবং মহামারীর রূপ ধারণ করত ।
বিষয়টি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নজরে আসে । এ থেকে পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে তারা গ্রামের মানুষকে পানি ফুটিয়ে পান করার পরামর্শ দিত । সেই সাথে তারা প্রতিটি গ্রামে রোগ জীবাণু মুক্ত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে বিনামূল্যে টিউবওয়েল সরবরাহের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর ফলে এই সমস্ত রোগের প্রকোপ হ্রাস পেতে শুরু করে। পরবর্তীতে বসন্তের টিকা আবিষ্কৃত হয়, টাইফয়েডের চিকিৎসা উদ্ভাবিত হয় এবং কলেরা রোগের জন্য খাবার স্যালাইন আবিষ্কার হয় । বিজ্ঞানীদের এই সমস্ত যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলে পর্যায়ক্রমে এই রোগগুলো কমতে কমতে এক পর্যায়ে বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয়ে যায় ।
আল্লাহর যিকির করে যেখানে রোগ-ব্যাধি আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল সেখানে বিজ্ঞানের কল্যাণে এই সমস্ত রোগ ব্যাধি থেকে মানুষ মুক্তি পেয়েছে । এটি সেই সময়কার লোকেরা স্বচক্ষে দেখেছে ।
তিনি আরো বললেন, তোমার দাদা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পাতলা পায়খানা করতে করতে আমার কোলে মৃত্যুবরণ করেছিল । চারিদিকে লোকজন বসে কোরআন তেলোয়াত ও দোয়া দরুদ পড়ছিল কিন্তু কোন কিছুই কাজে আসে নাই । অথচ ডায়রিয়া আজ কোন মারাত্মক রোগ নয় । সামান্য এক চিমটি লবণ এবং এক মুঠো চিনি দিয়ে সেলাইন বানিয়ে কয়েকবার খেলেই তা সহজে নিরাময় হয়ে যায় । এটিই হল প্রাকৃতির নিয়ম তথা বিজ্ঞান ।
তিনি আক্ষেপ করে বলতেন, বেকুবের দল এত কিছু স্বচক্ষে দেখার পরেও ধর্মীয় ফালতু বিশ্বাস ও তন্ত্র মন্ত্র পরিত্যাগ করে নাই এবং বিজ্ঞানকে গ্রহণ করে নাই । আসলে ধর্ম এদের মাথাটাকেই নষ্ট করে দিয়েছে ।
তাই দেশ ও জনগণের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য এই সমস্ত মিথ্যাকে বর্জন করতে হবে এবং সকলকে বিজ্ঞান মনস্ক হতে হবে ।

Comments
Post a Comment